Type Here to Get Search Results !

অভিনব শিক্ষক দিবস পালন করলেন 'রাস্তার মাস্টার'


নীলেশ দাস, আসানসোল:-করোনা পরিস্থিতে প্রাথমিক শিক্ষা লাটে উঠেছে,এই পরিস্থিতি দেখেই এমনই অসাধ্য সাধন করেছেন তিলকা মাঝি আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক দীপ নারায়ন নায়ক,তিনি সুপরিচিত 'রাস্তার মাস্টার' নামে কেউ বসে একমনে পড়ছে, কেউ লিখছে, কেউ আবার ছবি আঁকছে কিন্তু তাদের কারোর কাছে বই নেই, নেই কোনো খাতা-পেন এমনকি নিজস্ব কোনো স্লেট , তাহলে তারা লিখছে কোথায় ? এমন প্রশ্ন আপনার মনে আসতেই পারে।  তাহলে জেনে রাখুন এরা প্রত্যেকেই লেখাপড়া করছে তাদের কাঁচা মাটির দেওয়ালে। 

তিলকা মাঝি আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক দীপ নারায়ন নায়ক, যিনি এলাকায় রাস্তার মাস্টার হিসেবে সুপরিচিত। যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় বর্তমানে যাদের সামান্য পেন -খাতা কেনার সামর্থ্যটুকুও নেই কিন্তু আছে 'শিক্ষার অধিকার'। তাদের সে অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য 'রাস্তার মাস্টার' তাদের কাঁচা বাড়ির ভগ্নপ্রায় দেওয়ালগুলিতে পাকা রং করে সেগুলিকে শিক্ষা সহায়ক উপকরণ হিসাবে ব্যবহার করেছেন, সুপরিকল্পিত উপায়ে তৈরি করেছেন বহু ব্ল্যাকবোর্ড। 

লিখেছেন বর্ণপরিচয়, আলফাবেট থেকে শুরু করে করোনা থেকে বাঁচার উপায়, এমনকি ভ্যাকসিনের গুরুত্বের কথা একইসঙ্গে তিনি তুলে ধরেছেন। এর ফলে একদিকে যেমন আদিবাসী সমাজের ছাত্রছাত্রীরা 'দুয়ারে শিক্ষা' 'দুয়ারে স্কুল' পাচ্ছে অন্যদিকে তেমনি আদিবাসী মানুষদের মধ্যেও শিক্ষা সচেতনতা গড়ে উঠছে। আর দিনের কর্মসূচির তিনি নাম দিয়েছেন 'শূন্য থেকে শুরু' 

এর পাশাপাশি এদিন তিনি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে যে সমস্ত কুসংস্কার আছে সেগুলো দূর করার জন্য 'বিজ্ঞান শিক্ষা প্রসারে' বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছেন। এদিন তিনি আদিবাসী ছাত্র-ছাত্রীদের ফুলের পরাগ থেকে শুরু করে ম্যালেরিয়ার জীবাণু অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করান।ফলস্বরূপ ছাত্রছাত্রীরা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে স্পষ্ট ভাবে বুঝতে পারে ম্যালেরিয়া একটি জীবাণু ঘটিত রোগ এটি কোন 'ভূতে ধরা' বা 'দূষিত বাতাস' ঘটিত রোগ নয়। এরপর দীপ নারায়ন বাবু শিক্ষক দিবস উপলক্ষে ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ এর জীবন ও আদর্শকে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে তুলে ধরেন।

শিক্ষক দিবসে কর্মসূচির নাম 'শূন্য থেকে শুরু' কেন রাখা হয়েছে এ বিষয়ে 'রাস্তার মাস্টারকে' প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এখানকার অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী ফার্স্ট জেনারেশন লার্নার অর্থাৎ তাদের অভিবাবকরা তেমনভাবে কেউই প্রথাগত শিক্ষা নেয়নি। তাই এখানে তিনি শিক্ষা বিস্তার 'শূন্য' থেকে শুরু করেছেন একই রকমভাবে বিজ্ঞান সচেতনতাও শূন্য থেকে শুরু করেছেন। একইসঙ্গে তিনি বলেন আজকের এই কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি সমাজের সমস্ত কুসংস্কারকে দূর করে 'শূন্যে' নামিয়ে আনবেন ও সেইসঙ্গে স্কুল ছুট ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনবেন। 

এদিনের শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত জামুড়িয়া বিধানসভার বিধায়ক হরেরাম সিং ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করেন। এরপর তিনি রাস্তার মাস্টারের এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন আমরা প্রত্যেকেই আদিবাসী ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষার মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর। তিনি আরো বলেন মাস্টারমশাই যেভাবে কুসংস্কার দূরীকরণ ও বিজ্ঞান শিক্ষা প্রসারে কাজ করছেন তা প্রশংসনীয়। 

অন্যদিকে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী পায়েল মুর্মু, ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী রিয়া টুডু ও তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী মন্দিরা ওরাং 'দুয়ারের শিক্ষা' পেয়ে অত্যন্ত আনন্দ প্রকাশ করে  বলে, আমরা ১৮ মাসের বেশি সময় স্কুলে যাইনি কিন্তু স্যারের এখানে পড়লে মনে হয় আমরা যেন স্কুলেই পড়াশোনা করছি, এখানে পড়তে বেশ ভালো লাগে। অভিভাবক চুমকি মুর্মু, শীতল বাস্কি মাইক্রোস্কোপের নিচে ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু কে দেখে অবাক হয়ে বলে, এতদিনে বুঝলাম জ্বরে কাঁপুনি একটি রোগ, ভুতে লাগা নয় বলে জানায়।

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Below Post Ad